সঠিক অর্থে ‘প্রেম’

profile
Uttoran Roychowdhury
Mar 01, 2021   •  23 views

‘প্রেম’ – এই ছোট্ট শব্দটি শুনলে অনেকের মনে অনেক রকম প্রতিক্রিয়া হয়। কিন্তু এই কথাটি সঠিক অর্থে কী বোঝায় সে বোধ কি আমাদের আছে? লোকে প্রেমে পড়তে ভালবাসে, কিন্তু প্রেম যে কী তা বোঝে না। সাধারণত ‘প্রেম করা’ বলতে গিয়ে প্রেম কথাটাকে যতটা লঘু করা হয়, আসলে ব্যাপারটা অতটা হালকা এবং সহজ মোটেই নয়। বিশেষত এই যুগে প্রেমকে খুবই নীচু স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রেম খুবই শুদ্ধ, পবিত্র এবং তার স্থান অতি উচ্চ পর্যায়ে। সঠিক অর্থে ‘প্রেম’ বলতে কী বোঝায়? প্রেমের প্রাথমিক দিকগুলো আমরা কিছুটা বোঝার চেষ্টা করব।

প্রথমত, প্রেমে ভয়ের কোনো স্থান নেই। ভয় আসে সীমাবদ্ধতার বোধ থেকে – ভয়ের সম্মুখীন আমরা জীবনে সকলেই হয়ে থাকি কারণ নিজেকে আমরা এই বিরাট জগতে অতি সীমিত মনে করি। প্রেম নিজেই সীমাহীন, তাই সে সকল সীমানাকে ভেঙে দেয়। প্রেম মানুষকে ভয়শূন্য করে তোলে। প্রেমে মানুষ নিজের সব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে যেতে পারে। যেখানে ভয় আছে সেটা প্রেম হতে পারে না। প্রেমে মানুষ তার প্রেমাস্পদের সাথে একাকার হয়ে যায় – সেই একত্ববোধে কি ভয়ের কোনো স্থান থাকতে পারে? সেখানে এই ‘ক্ষুদ্র আমি’-র আমিত্ব প্রেমের অসীম সমুদ্রে হারিয়ে যায়। শুদ্ধ প্রেমের অনুভূতিতে আমাদের ইন্দ্রিয় অন্তর্মুখী হয়, মন সেই প্রেমে ডুব দেয় – সেখানে ‘আমি-তুমি’ ভেদ নেই, ‘ভিতর-বাহির’ বোধ নেই – সমস্ত দ্বৈতবোধ প্রেমসাগরে তলিয়ে একাকার হয়ে যায় – সেখানে কিসের ভয়? একথা তো সন্তানপ্রেমের ক্ষেত্রেও সত্য – একজন মা, তিনি স্বভাবত যতই দুর্বল হোন না কেন, নিজের সন্তানকে রক্ষা করতে তিনি বাঘের সাথে সম্মুখ সমরে যেতেও পিছপা হবেন না।

দ্বিতীয়ত, প্রেমে কোনো প্রত্যাশা হয় না। প্রেম কিছু চায় না, শুধু দিতে জানে। উলটো দিক থেকে যা কিছু অপ্রত্যাশিত আসুক না কেন, তা ঠিক একদিন চলে যাবে, শুধু প্রেমটা থেকে যাবে। প্রেমে কিছু চাওয়ার নেই, শুধুই দেওয়ার আছে। যখন কেউ তার প্রেমাস্পদের সাথে দেখা করতে যায়, তাদের মধ্যে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকে না – থাকে প্রেমের সম্পর্ক। প্রেম কোনো ভিখারি নয়। ‘আমি তোমাকে তোমার সাজপোশাক, রাজনৈতিক চিন্তাধারা বা সঙ্গীতের প্রতি ঝোঁকের কারণে ভালবাসি’ – এহেন কথা যে বলে সে ভালবাসে না। প্রেম হবে নিঃশর্ত – যদি তা নিঃশর্ত না হয় তবে তা প্রেমই নয়। প্রেমে কোনো শর্ত হয় না, প্রেমের কোনো কারণ হয় না – তা সে মানবিক স্তরেই হোক বা আধ্যাত্মিক। প্রেম শুধু একটা পথ নয়, প্রেমটাই গন্তব্য।

তৃতীয়ত, প্রেমে আছে পূর্ণ স্বাধীনতা কারণ প্রেম মানেই মুক্তি। আমরা আগেই দেখেছি যে প্রেম নিজেই সীমাহীন তাই সে সমস্ত গণ্ডি ভেঙে দেয়। প্রেমে কেউ বদ্ধ হয় না, প্রেমে মুক্ত হয়। আমরা ইতঃপূর্বে এও দেখেছি যে প্রেম হবে নিঃশর্ত – সীমাহীন প্রেমের অবিরত ধারার পিছনে কোনো কারণ নেই। এই জগতে আমাদের সকল প্রকার বন্ধনের কারণ হল ‘মায়া’, যার মাধ্যমে পরম সত্য এই আপেক্ষিক জগৎরূপে প্রকাশিত হয়। এখন এই মায়ার তিনটি প্রধান উপাদান হল দেশ (space), কাল (time) ও নিমিত্ত (causation)। আমরা সকলে এই দেশ, কাল ও নিমিত্ত দ্বারাই সীমিত। নিমিত্ত হল কার্য-কারণ (cause and effect) সম্পর্কের এক অনাদি ধারা – এই জগতের সবকিছুই কোনো একটি কারণের কার্য, অর্থাৎ কোনো একটি কারণ হতেই উৎপন্ন। সবকিছুর পিছনেই একটা কারণ আছে, কিন্তু একটু আগেই আমরা দেখলাম যে প্রেমের কোনো কারণ নেই – আর ঠিক এইভাবেই প্রেম নিমিত্তের শিকল ভেঙে আমাদের মায়ার ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। প্রেম আমাদের মুক্ত করে।

পরিশেষে বলি, প্রেম যেন একটি অতি সংকীর্ণ গলির মতো যেখানে দু’জনও দাঁড়াতে বা চলতে পারে না, অর্থাৎ প্রেমে পৃথক দুজনের স্থান নেই – আমি থাকলে তুমি নেই, আবার তুমি থাকলে আমি নেই। তাই প্রেমের সম্পর্কে আমিত্ববোধ বেশি মাথাচাড়া দিলে সেই সম্পর্কে ক্ষতি হয়, কারণ তখন ‘আমি’-কে প্রাধান্য দিতে গিয়ে প্রেমাস্পদের গুরত্ব কমে যায়, তাকে অবহেলা করা হয়। অপরদিকে প্রেমে ‘তুমি তুমি’ করে সমস্ত অহংকার ও স্বার্থ ত্যাগ করে সমর্পণ করলে পূর্ণতা লাভ হয়।

0



  0